মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান

 বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা,বিস্ময় প্রতিভা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এই বৈচিত্র্যময় পুরুষই বাংলা সাহিত্যে যে শক্তিময়তার অভাব ছিল সেই শূন্যতা তাঁর সৃষ্টি দ্বারা তিনি অবলীলায় পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছেন।তাঁর বলিষ্ঠ লেখা দিয়ে অল্প সময়েই তুমুল নিন্দা ও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। হিসেব করে দেখলে মাত্র বাইশ বছর সময় তিনি সাহিত্য সৃষ্টির জন্য পেয়েছেন।৪২ বছর বয়সে ১৯৪১ সালে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন।এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছর জীবন্মৃত অবস্থায় জীবন কাটাতে হয়।সব মিলে তাঁর দীর্ঘ অথচ স্বল্প জীবনকাল-জন্ম,মৃত্যু, নির্বাক-সচেতন রোগাক্রান্ত, সাহিত্য সৃষ্টি,সংগীত সৃষ্টি,সৈনিক জীবন,কবিতার জন্য কারাজীবন,অন্য ধর্মের নারীর সঙ্গে বিয়ে,সন্তানের অকাল মৃত্যু,বাঁধনহারা ছন্নছাড়া অনিশ্চিত জীবন-যাপন,কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক,সমাজতন্ত্র, বৈষ্ণব প্রভাব,ইসলামী সংগীতের সঙ্গে কৃষ্ণ -কালী-চৈতন্য দেব বর্ণনা, আরবী-ফারসি শব্দের ব্যবহার,উদার অসাম্প্রদায়িক মন-মানসিকতা ইত্যাদির সমাহারে বর্ণাঢ্য,দুঃসাহসী,জীবন। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কবি নজরুল পেয়েছেন প্রতিষ্ঠা। জাতি বৈষম্য,শ্রেণী বৈষম্যের প্রতি তাঁর কন্ঠ সব সময়ই সোচ্চার ছিল।তাই তিনি তার 'কুলি-মজুর' কবিতায় লিখেছেন  "দেখিনু সেদিন রেলে,

কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে টেনে দিলে নিচে ফেলে!

চোখ ফেটে এল জল, এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?" তিনি নির্যাতিত শ্রেণীর মুক্তির কথা ভেবেছেন।তিনি চেয়েছেন সাম্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে। ১৯২১-এর ডিসেম্বরে নজরুল রচনা করেন 'বিদ্রোহী' কবিতা। ১৯২২-এর ৬ জানুয়ারি  'সাপ্তাহিক বিজলী' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় 'বিদ্রোহী'।নজরুলের এই কবিতায় ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেওয়ার এবং খোদার আসন আরশ ছেদিয়া উঠবার ঘোষণা রয়েছে,তাই তিনি তখনকার সময়ে বেশ সমালোচিত হন।অনেকেই নজরুল ইসলামকে 'খোদাদ্রোহী নরাধম ' বলে আখ্যায়িত করেন।প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচারণের ক্ষেত্রে কখনোই সক্রিয় ছিলেন না ফলে তাকে বারবার ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের রোষানলে পড়তে হয়েছে।কবি বড় হওয়ার সময়টাতে দেখেছেন সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প কিভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল,রুপ নিয়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। তাই তিনি লিখেছিলেন "মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।" রক্ষণশীল সামাজিক চেতনাহীন কতিপয় মুসলমান যেমন তাকে কাফের বলে আখ্যায়িত করেছিল তেমনি কট্টরপন্থী হিন্দুরাও নানা ভাবে আক্রমণ করেছিল।স্রষ্টা কে পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি লিখেছেন " শাস্ত্র না ঘেঁটে সখা,ডুব দাও সত্য সিন্ধু জলে" ছদ্মবেশী ধর্মব্যবসা করা মোল্লা আর ভণ্ড সাধুদের প্রতি ক্ষুব্ধ নজরুল বলেছেন " শিহরি উঠো না,শাস্ত্রবিদেরে,করো নাক বীর ভয়,তাহারা খোদার খোদ প্রাইভেট সেক্রেটারি তো নয়,সকলের মাঝে প্রকাশ তাহার সকলের মাঝে তিনি আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি " কবি নজরুল ইসলাম সব ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে মানবতার জয়গান গেয়েছেন। তাঁর একটি কবিতার বিখ্যাত লাইন হলো "মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,নহে কিছু মহীয়ান"। 



নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয়। স্থানীয় এক মসজিদে সম্মানিত মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজও করেছিলেন। কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে যেয়ে তিনি কবিতা,নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন।এসময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মত কবিতা; ধূমকেতুর মত সাময়িকী। জেলে বন্দী হলে পরে লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী,এই সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত।জীবিকার তাগিদে বাল্যকালে অনেককিছুই করতে হয়েছে কবিকে এমনকি চায়ের দোকানে রুটি বানানোর কাজ করেছেন।তিনি শুধু কবি ছিলেন না,তিনি ছিলেন গীতিকার,সুরকার,গল্পকার, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক কর্মীও।কথিত আছে কলকাতায় কলেজ স্ট্রিটে হ্যারিসন রোডের মুখে একটা রিক্সাওয়ালাকে তিনি একদিন রাত বারোটায় গিয়ে বলেছিলেন 'এই তুই তো অনেককেই নিয়ে যাস রিক্সায় টেনে। ঠিক আছে আজ তুই রিক্সায় বোস আর আমি তোকে টেনে নিয়ে যাই।" তাঁর প্রত্যেকটা কাজকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসা আর মানুষের মুক্তির আকাঙ্খা। জীবনে অনেক দুঃখকষ্ট পেলেও তিনি কিন্তু মোটেই গোমড়ামুখো ছিলেন না।ছিলেন দারুণ হাসিখুশি,চঞ্চল, ছটফটে একজন মানুষ। তাই নজরুল ইসলাম আমাদের প্রেরণা, নজরুল আমাদের সত্তায়,মননে।


          আনছারুল্লাহ তালুকদার 

        ছাত্র,গণজ্ঞাপন বিভাগ, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Comments

  1. পড়ে ভালো লাগলো। অনেক কিছু নুতন জানতে পারলাম।

    ReplyDelete
  2. অশেষ ধন্যবাদ বন্ধু! ভাল থাকি!!

    ReplyDelete
  3. Khub bhalo likhechish bondhu... Looking forward for more...

    ReplyDelete
    Replies
    1. অশেষ ধন্যবাদ ঐশ্বর্যা।

      Delete
  4. Khub valo hoyeche anchu🤩🤩🔥

    ReplyDelete
    Replies
    1. অশেষ ধন্যবাদ বন্ধু। ভাল থাকিস।

      Delete
  5. Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ সৌমেন।

      Delete
  6. Mon bhore gelo tor lekha dekhe! Chaliye jaaa bndhu!

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

My village is called Tarinipur,Katigorah .It is in the Cachar district of Assam

Sahdev Dirdo became a viral sensation after a video of him singing ‘Bachpan Ka Pyar’

“If people are good only because they fear punishment, and hope for reward, then we are a sorry lot indeed.”